ট্রাইব্যুনালের শহীদ ইমনের মায়ের জবানবন্দি

‘ছেলের লাশ পেয়েছেন, কাঁদতে পারবেন না, কাঁদলে লাশ গায়েব করে দেব’

গেজেট প্রতিবেদন

জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেন রিকশাচালক ইমন। মা তাকে আন্দোলনে যেতে বারণ করলে তিনি বলেন, ‘আমার বয়সী ছেলেদের কীভাবে মেরে ফেলছে; আমি কেন আন্দোলনে যাব না।’ পরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি। তার লাশ বাসায় নিয়ে এলে আওয়ামী লীগের একজন হুমকি দিয়ে বলেন, ‘ছেলের লাশ পেয়েছেন, কাঁদতে পারবেন না; কাঁদলে লাশ গায়েব করে দেব।’

বুধবার (৭ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শহীদ ইমনের মা কুলসুম বেগমের জবানবন্দিতে ঘটনার হৃদয়বিদারক বর্ণনা উঠে আসে। জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।

জবানবন্দিতে শহীদ ইমনের মা কুলসুম বেগম বলেন, আমার বর্তমান বয়স ৪২ বছর। আমি শহীদ ইমনের মা। ইমনের বয়স ছিল ১৪ বছর। সে রিকশা চালাত এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে যেত। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ইমন আন্দোলনে যায়। ওই দিন আমার মেয়ের ভাসুর গুলিতে মারা যায়। সেদিন রাতে কারফিউ জারি করা হয়। আমি আমার ছেলেকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করি। তখন সে শহীদ ইয়ামিন হত্যার একটি ভিডিও দেখিয়ে বলে, দেখছো আমার বয়সী ছেলেদের কীভাবে মেরে ফেলছে; আমি কেন আন্দোলনে যাব না।

২০ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে ইমন তার বন্ধু নাইম ও শাহীনসহ বাসা থেকে বের হয়। আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে শাহীন বাসায় এসে আমার বড় ছেলে রাজীবকে জানান, ইমন গুলি খেয়েছে। তখন আমি, আমার স্বামী ও বড় ছেলে রাজীব এম জেড হাসপাতালের সামনে তেঁতুলতলার মোড়ে যাই। যাওয়ার পথে দেখি চারদিক থেকে গুলি হচ্ছিল। এমনকি উপরের দিক থেকেও গুলি ছোড়া হচ্ছিল। সেখানে গিয়ে দেখি আমার ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তার জ্ঞান ছিল না। ছেলেকে এ অবস্থায় দেখে আমিও জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে জানতে পারি, আমি এবং ইমনকে তিনজন ব্যক্তি রিকশা করে আমার বাসার সামনে রাস্তায় নিয়ে আসে।

বাসায় আনার পর জ্ঞান ফিরলে আমি বাসার সামনে ছেলের লাশ দেখতে পাই। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেখি, তার মাথার পিছনে খুলিতে ছোট একটি ফুটা এবং বাম গালের চামড়া ইঁদুরের গর্তের মতো হয়ে ঝুলে আছে। বুকের একপাশে গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। তখন লম্বা চুলওয়ালা আওয়ামী লীগের একজন এসে ধমক দিয়ে বলেন, লাশ পেয়েছেন, কাঁদতে পারবেন না; কাঁদলে লাশ গায়েব করে দিব তখন আমার বড় ছেলে রাজীব একটি মসজিদে খাটিয়ার জন্য গেলে তাকে খাটিয়া দেওয়া হয়নি। অন্য একটি মসজিদে গেলে খাটিয়াসহ গোসল করানোর লোক এসে আমার ছেলেকে গোসল দেয়। তারপর তার জানাজা শেষে রাত ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ছেলের লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিই। তখনও চারদিক থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছিল। পথে তিন জায়গায় আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন লাশ নিয়ে যেতে বাধা দেয়। আমি অনুরোধ করলে তিন জায়গা থেকেই ছাড়া পাই। পরদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে আমার ছেলের লাশ দাফন করা হয়।

আমার ছেলের হত্যার জন্য শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন, কামরুল ইসলামদের দায়ী করি। এক পর্যায়ে সাক্ষী অঝোরে কাঁদতে থাকেন। ১৯ জুলাই কারফিউ না দিলে আমার ছেলে বেঁচে থাকত। আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।

খুলনা গেজেট/উউরা




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন